শব্দ অনুকরণের জাদুকর গ্রে প্যারট

আফ্রিকার রেইনফরেস্ট অঞ্চলে প্রায়ই দেখা মিলবে আফ্রিকান গে প্যারটের। দিনের অধিকাংশ সময়ই গাছের মগডালে বসে নিরিবিলি সময় কাটে তার। তাই হয়তো বিশ্বে পোষা পাখিদের তালিকায় আফ্রিকান গ্রে প্যারটের বেশ কদর। বছরের যে সময়টায় গাছে ফুল আসে তখন অবশ্য প্যারটেরা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে আসে, যেখানে ফুলের তুলনায় কাঠের হার বেশি। আফ্রিকার দেশ কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে ঘর জঙ্গলের উচু অংশে যেমন এদের দেখা পাওয়া যায়, আবার সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাতেও নিরিবিলি বসে থাকতে দেখা যায়।

মানুষের কাছাকাছি থাকা পাখিদের মধ্যে আফ্রিকান গ্রে প্যারট বেশ অন্যতম। পশ্চিম আফ্রিকার পাম চাষের এলাকায় এই পাখিদের বসবাসের জন্য বাসা বানিয়ে দেয়া হয়, যাতে পাম চাষের এলাকায় তারা বাস করতে পারে। আর কে না জানে, প্যারটের পছন্দের খাদ্য তালিকার শীর্ষেই আছে বাদাম। এর বাইরে বনাঞ্চলের ফল, ছোটো প্রতঙ্গও রয়েছে প্যারটের খাদ্য তালিকায়। বাকানো ঠোট আর নখরযুক্ত পা দিয়ে খুটে খুটে খাবার খায় আফ্রিকান গ্রে প্যারট। যদিও যেকোনো পাঁকা ফলই এদের খাদ্য তালিকার শীর্ষে।

ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলবেধে খাবারের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে প্যারটেরা। শুরুর দিকে এরা বনাঞ্চলের উচু গাছগুলোতে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে খাবারের সন্ধানে। খাবারের সন্ধান পাওয়া মাত্রই সেদিকে চলে যাবার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকাই এদের স্বভাব। অনেক সময় খাবারের সন্ধানে অনেকটা দূরেও যেতে হয়। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দ্বীপে হাজার হাজার আফ্রিকান গ্রে প্যারট দেখতে পাওয়া যায়। এক পর্তুগিজ নাবিক একবার বলেছিলেন যে, তিনি আফ্রিকার একটি দ্বীপের পাশ দিয়ে যাবার সময় গোটা দ্বীপটিকে আফ্রিকান গ্রে প্যারটে ঢাকা দেখেছিলেন। অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থা এখন আর নেই। বিশ্বজুড়েই জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মানবসৃষ্ট কারণে ক্রমশ পাখিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

অন্যান্য পাখিদের তুলনায় আফ্রিকান গ্রে প্যারট বেশ দ্রুত উড়ে বেড়ায়। পাতলা পাখনা ব্যবহার করে খুব সহজেই বাতাসের ভর কেটে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পটু এই প্যারটেরা। উড়ে যাবার সময় স্বাভাবিক প্রবনতার অংশ হিসেবে শিষ দেয়া এবং মাঝে মাঝে ঘুর্ণির সৃষ্টি করে বাতাসের মধ্যে। তবে দলবেধে যাবার সময় সমবেতভাবে শিষ দেয় এরা। মানুষের মধ্যে যেমন নিজেকে সজ্জিত করার একটা প্রবনতা রয়েছে, তেমনি আফ্রিকান গ্রে প্যারটের মধ্যেও এই প্রবনতা দেখা যায়। অনেক প্যারটের পাখনার ভেতরে বিভিন্ন আকারের কাঠের টুকরো গোজা থাকে। এমনটি ঠোটের মাঝে কোনো পাতা রেখেও অনেক পাখি সারাদিন ঘুরে বেড়ায়।

গ্রে প্যারটের প্রজননের ব্যাপারে খুব বেশি একটা জানা যায় না। কারণ গভীর অরণ্যের মধ্যে তারা প্রজনন করে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক সময়ই মূলত এদের প্রজননের সঠিক সময়। কোনো ভাঙা বা মরা গাছের মগডালে বাসা বাধে এরা। মাটি থেকে প্রায় ১০০ ফুট উপরে থাকে এদের বাসা। প্রতিটি নারী গ্রে প্যারট একেকবার ২ থেকে ৪টি ডিম দিতে পারে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। এসময় বাবা-মা পাখিরা সন্তানের জন্য দূর দূরান্ত থেকে খাবার সংগ্রহ করে আসে। পরবর্তী ২-৩ মাসের মধ্যে বাচ্চা পাখিটি উড়ার মতো সক্ষম হয়ে যায়।

এই পাখির দেহের বর্ননা করতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় এদের জিহ্বার কথা। গ্রে প্যারটের জিহ্বা বেশ পুরু ও মাংসল। ঠোট দিয়ে বাদামের খোসা ভাঙার পর জিহ্বা দিয়ে বাকী কাজটুকু করে। এরপরেই আসে এদের চোখের কথা। মাথার ঠিক দুপাশের মধ্যখানে চোখের অবস্থান। যার মানে, গ্রে প্যারট মাথা দুপাশে ঝাকালেই একবারে তার চারপাশ দেখতে পারে। এজন্য তাকে পেছনে ঘুরতে হয় না। প্যারটের বিশেষত্বই তার ঠোটে। পুরু বাদামের খোসা ভাঙতে জুরি নেই প্যারটদের। শুধু আহারের কাজেই নয়, গাছের শাখার সঙ্গে ঝুলে থাকার জন্যও অনেক সময় ঠোট ব্যাবহার করে এরা। পায়ের পাতা পেছন দিকে বাকানো, ফলে গাছে অনায়াসে হেটেই উঠে যেতে পারে প্যারট। আর লাল রংয়ের লেজের কথা না বললেই নয়, আফ্রিকান গ্রে প্যারট বিখ্যাত যেমন এর কণ্ঠস্বরের জন্য, তেমনি বিখ্যাত এর লাল রংয়ের লেজের জন্য।

আপনি জানেন কি? গ্রে প্যারট শব্দ অনুকরণ করতে ওস্তাদ। এমনকি প্রতিধ্বনিও অনুকরণ করতে পারে এই পাখি। যেমন ধরা যাক দরজা খোলার শব্দ, টেলিফোন বাজার শব্দ। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করতে জুরি নেই গ্রে প্যারটের। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মানুষ ৩৪০ প্রজাতির প্যারটের সন্ধান পেয়েছে। যাদের অধিকাংশই বাস করে গ্রীস্মমণ্ডলীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে।

 ওয়াইল্ডডিজনি

Comments

Popular Posts